দেশে মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নসহ উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনার প্রধান উৎস বিদেশী ঋণ। বিদেশী ঋণের স্থিতি ১০৪ বিলিয়ন ডলারের বেশি। বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় এ ঋণের সিংহভাগই নেয়া হয় বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে ১৫ বছরে। যদিও অর্থনীতিবিদরা বলেছেন, দেশের আয় ও পরিশোধের সক্ষমতা বিবেচনায় এ ঋণের পরিমাণ অনেক বেশি। বিশ্বের অন্যান্য দেশের তুলনায় এসব প্রকল্পের বাস্তবায়ন ব্যয়ও বেশি। প্রয়োজনের চেয়ে অপ্রয়োজনীয় প্রকল্পেই বেশি ঋণ করা হয়েছে। ফলে প্রকল্প চালু হলেও তা থেকে প্রত্যাশা অনুযায়ী রিটার্ন আসছে না। ঋণ করেই এখন ঋণের অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে সরকারকে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে গত বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। ফলে দেশের অর্থনীতি ও রাজনীতিতে এক ধরনের অস্থিতিশীলতা দেখা দেয়। যদিও দেশের রাজনীতি ও অর্থনীতিতে এখনো স্থিতিশীলতা ফিরে আসেনি। আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতিরও উন্নতি হয়নি। বৈদেশিক সহায়তা বা ঋণ পেতে হলে প্রথমত দরকার প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন; দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা। বর্তমান সরকার নতুন কোনো মেগা প্রকল্প গ্রহণ করছে না। আগের প্রকল্পের কাজও ধীরগতিতে চলছে। ফলে গত অর্থবছরে অর্থাৎ ২০২৪-২৫ অর্থবছরে কমেছে বৈদেশিক সহায়তা। কিন্তু বেড়েছে ঋণ পরিশোধ।
বিগত সরকার উন্নয়নের কথা বলে লুটপাটের উদ্দেশে বাছবিচারহীন প্রকল্পে অর্থের অপব্যবহারের কারণেই সরকারের ঋণ এতটা স্ফীত হয়েছে। এসব ঋণের বেশকিছু অংশ অডিয়াস ডেট হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। এজন্য সরকারকে সংশ্লিষ্ট দাতাদেশ ও সংস্থাগুলোর সঙ্গে আলোচনা চালাতে হবে। এ অবস্থায় সরকারকে বিদেশী ঋণের শর্ত নমনীয় করার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর সঙ্গে দরকষাকষি করতে হবে। বিশেষ করে ঋণ পুনর্গঠন ও সুদহার কমাতে বিভিন্ন দাতাদেশ ও সংস্থার সঙ্গে আলোচনা শুরুর উদ্যোগ গ্রহণ করা গুরুত্বপূর্ণ, যাতে সহনীয়ভাবে ঋণ পরিশোধ করা যায়। তাছাড়া দেশের বার্ষিক কত বিলিয়ন ডলার সুদ পরিশোধে ব্যয় করতে হয় এবং কত ডলার আমাদের সক্ষমতা রয়েছে সেটিও বিবেচনা করা উচিত। শুধু যে বিগত সরকারের ঋণের সুদ পরিশোধ করতে হচ্ছে তা নয়, বর্তমান সরকার বাজেটের জন্যও বিদেশী ঋণ নিয়েছে, সেটিও আগের ঋণের সঙ্গে যুক্ত হবে। নতুন করে বিদেশী ঋণ নেয়ার ক্ষেত্রে খুব সাবধান থাকতে হবে। আমাদের ঋণ পরিশোধের যে প্রক্ষেপণ করা হয়, সেক্ষেত্রেও অস্পষ্টতা রয়েছে, সেগুলোকে ঠিক করতে হবে। তা না হলে নীতিনির্ধারকরা সময়মতো সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না।
সরকারি অর্থায়নের প্রকল্পের মতো বিদেশী ঋণের প্রকল্প বাস্তবায়নেও গতি কমেছে নতুন সরকারের সময়ে। অনেক বৈদেশিক অর্থায়নের প্রকল্পেরও ঠিকাদার চলে গেছে। অনেক প্রকল্পে পরিচালক পরিবর্তন হয়েছে। এর প্রভাব পড়েছে বাস্তবায়নে। আবার বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন স্থবির হয়ে গেছে বলে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমেছে। এসব কারণে বাস্তবায়ন কাজও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে উন্নয়ন প্রকল্পে বৈদেশিক অর্থছাড় কমেছে। নতুন করে সহায়তার প্রতিশ্রুতি কমে গেছে। সরকার যেসব সংস্কার কার্যক্রম হাতে নিয়েছে, সেগুলোর পরিকল্পনা চূড়ান্ত হয়ে এলে এবং রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা এলে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছ থেকে সহায়তার পরিমাণ বাড়বে।
দেশে বড় বড় মেগা প্রকল্প বাস্তবায়নে বিগত সরকার বিপুল পরিমাণ বিদেশী ঋণ নিয়েছে। এসব প্রকল্পের অনেকগুলোই বাস্তবায়ন হয়েছে। বেশ কয়েকটির কাজ এখনো চলমান। এরই মধ্যে বাস্তবায়িত অনেক প্রকল্পের বিদেশী ঋণ পরিশোধ শুরু হয়েছে। দুই বছরের বেশি সময় ধরে বিদেশী ঋণ পরিশোধের চাপ ক্রমেই বাড়ছে। সামনে আরো বাড়বে। এতে সরকারের বৈদেশিক মুদ্রা ও রিজার্ভ দুটোই বেশ চাপে পড়ছে। বর্তমান সরকারকেও বিভিন্ন ধরনের বকেয়া ও ঋণ পরিশোধের চাপ সামলাতে হচ্ছে। যদিও গত অর্থবছর পদ্মা রেল সংযোগ, মেট্রো রেল ও কর্ণফুলী টানেলসহ বেশকিছু বড় প্রকল্পের ঋণ পরিশোধ শুরু হয়েছে। ফলে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধে আলাদা চাপ তৈরি হয়েছে। কিন্তু মেট্রো রেল ছাড়া পদ্মা রেল সংযোগ ও কর্ণফুলী টানেল থেকে তেমন রিটার্ন আসছে না। যে আয় আসছে তার চেয়ে বেশি রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় হয়ে যাচ্ছে।
২০২৩-২৪ অর্থবছরে সরকার ৩ বিলিয়ন ডলার বিদেশী ঋণ পরিশোধ করলেও বিদায়ী অর্থবছরে তা ৪ বিলিয়ন ছাড়িয়ে গেছে। পর্যায়ক্রমে এ ঋণ পরিশোধের চাপ আরো বাড়বে। কেননা গত অর্থবছরে বিদেশী ঋণের আসল পরিশোধ যে গতিতে বেড়েছে, তার চেয়ে বেশি গতিতে বেড়েছে সুদ বাবদ ব্যয়। কিন্তু যে ঋণ পরিশোধ করা হচ্ছে সেটিও বেশি মনে হতো না, যদি ওইসব ঋণের সদ্ব্যবহার করা যেত ও অর্থনীতি গতিশীল হতো। বিগত সরকারের আমলে নেয়া ঋণের প্রকল্পে অনেক অপচয় ও দুর্নীতি হয়েছে, যার প্রভাব পড়ছে প্রকল্প বাস্তবায়নের পর।
এদিকে সামনের বছরগুলোয় ঋণ পরিশোধে আরো চাপ বাড়বে। কারণ স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের পর বিদেশী সহায়তার উৎস কমে যাবে। এছাড়া বাংলাদেশকে তুলনামূলক বেশি সুদে বিদেশী ঋণ নিতে হবে। উন্নয়ন সহযোগী দেশ ও সংস্থার কাছে নমনীয় ঋণ ছাড় কমবে। অর্থাৎ ভবিষ্যতে বিদেশী ঋণ পরিস্থিতি ধীরে ধীরে অসম্ভব উদ্বেগের জায়গায় যাচ্ছে। ডলারের জোগান ও রাজস্ব আয় না বাড়লে পরিস্থিতি আরো খারাপ হবে।
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা একটি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও বৈদেশিক সহায়তা আকর্ষণের জন্য অন্যতম প্রধান পূর্বশর্ত। রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল পরিবেশ বিদেশী উন্নয়ন অংশীদার ও দাতাদের আস্থা বাড়ায়, যা সরাসরি বৈদেশিক সহায়তা ও বিনিয়োগপ্রবাহ বৃদ্ধিতে সহায়তা করে। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য প্রয়োজন দেশে একটি গ্রহণযোগ্য ও সুষ্ঠু নির্বাচন। যদিও গণ-অভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তিকে ঘিরে আগস্টের প্রথম সপ্তাহে জাতীয় নির্বাচনের দিনক্ষণ ঘোষণা করতে পারে অন্তর্বর্তী সরকার। জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষণের মাধ্যমে বিষয়টি জানাতে পারেন প্রধান উপদেষ্টা। সরকারের বিভিন্ন সূত্র বলছে, ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচন আয়োজনের জন্য নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিতে অনুরোধ করবে সরকার। অন্যদিকে ৫ আগস্টের মধ্যে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্যের ভিত্তিতে জুলাই সনদ ঘোষণা করা হতে পারে। যদি সরকারের ঘোষিত সময়ের মধ্যে একটি সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব হয় এবং নির্বাচিত সরকার দেশের দায়িত্ব গ্রহণ করে তাহলে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা আসবে।
বিদেশী সহায়তা বাড়াতে হলে দরকার রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা। ঋণ পরিশোধের চাপ কমাতে দরকার ডলারের প্রবাহ বাড়ানো। তবে প্রকল্পের কাজ নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে শেষ করতে না পারা বাংলাদেশের একটি বড় সমস্যা। বরাদ্দকৃত অর্থও সময়মতো ব্যয় করতে পারে না। ফলে দাতা সংস্থাগুলোর বড় অংকের প্রতিশ্রুতি পুঞ্জীভূত হয়ে পড়ে। তবে প্রকল্প বাস্তবায়নে গতিশীলতা এলে সহায়তার প্রতিশ্রুতি ও অর্থছাড় উভয়ই বাড়তে পারে। ডলারের প্রবাহ বাড়াতে বৈদেশিক ঋণ ছাড়াও রফতানি আয় ও রেমিট্যান্স ভূমিকা রাখে। এজন্য আমাদের রফতানি বৈচিত্র্য বাড়ানো দরকার। ঋণ পরিশোধের চাপ মোকাবেলায় রাজস্ব আহরণ বাড়ানোসহ রফতানি বৈচিত্র্যকরণের মাধ্যমে রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়াতে হবে। অর্থাৎ নতুনভাবে ঋণ নিয়ে ঋণ পরিশোধ না করে নিজস্ব অর্থায়নের মাধ্যমে ঋণ পরিশোধে সক্ষমতা বাড়ানো প্রয়োজন।